
সাতক্ষীরায় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জেলাজুড়ে। শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে অনুভূত এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল জেলার আশাশুনি উপজেলা। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এ কম্পনে জেলার বিভিন্ন স্থানে মানুষ আতঙ্কে ঘরবাড়ি, মসজিদ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। শ্যামনগরে কয়েকটি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে, কোথাও মাটির ঘর আংশিক ধসে পড়েছে। সেখানে তিনজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
ভূমিকম্পের সময় অনেকেই জুমার নামাজ আদায় করছিলেন। এতে জেলার বিভিন্ন স্থানে মুসল্লিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে দ্রুত মসজিদ থেকে বের হয়ে খোলা স্থানে অবস্থান নেন। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা শ্মশান ঘাটের পাচিল, তালা উপজেলার নগরঘাটা গ্রামের কয়েকটি কাঁচা ঘরবাড়ি, অর্ধ-শতাধিক বাড়ির দেয়ালে ফাটলসহ ছোটছোট ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
সাতক্ষীরা শহরের ৫নং ওয়ার্ডের মেঝমিয়ার মোড় এলাকার কৃষিবিদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, জুমার নামাজ শেষে বন্ধুর সঙ্গে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। হঠাৎ পায়ের নিচের মাটি কেঁপে ওঠে। বিকট শব্দের সঙ্গে কয়েক সেকেন্ড চারপাশ দুলতে থাকে। তখন আশপাশের মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। কাটিয়া এলাকার গৃহবধূ রোকসানা আক্তার বলেন, ঘরের ভেতরে কাজ করছিলেন। হঠাৎ মনে হয় শরীর একবার ডানদিকে আবার বামদিকে ঢলে পড়ছে। আতঙ্কে দ্রুত বাইরে বের হয়ে আসেন। তখন আশপাশের কিশোর-কিশোরীসহ অনেকেই চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। একই এলাকার বাসিন্দা জাহারুল ইসলাম টুটুল বলেন, জুমার নামাজের সময় হঠাৎ দোতলা মসজিদটি দুলতে শুরু করলে মুসল্লিরা দ্রুত বাইরে বের হয়ে আসেন।
ভূমিকম্পে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। কোথাও মাটির ঘর আংশিক ধসে পড়েছে, আবার কোথাও ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেয়াল, ছাদ ও পিলারসহ বিভিন্ন অংশ। উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের সোনাখালি এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্পে তাঁর একমাত্র মাটির ঘরটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং কিছু অংশ ধসে পড়েছে।
শ্যামনগর পৌরসভার নূর কম্পিউটার মার্কেটের পাশে অবস্থিত তালাবদ্ধ আওয়ামী লীগ অফিসের ভবনে ফাটল ধরেছে বলে স্থানীয়রা জানান। একই এলাকার পার্শ্ববর্তী আরও কয়েকটি ভবনেও ফাটল দেখা গেছে। গাবুরা ইউনিয়নের হরিশখালি এলাকায় একটি মসজিদে ফাটল ধরার পাশাপাশি ভেতরের টাইলস খুলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চুনকুড়ি নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা আকবর হোসেন বলেন, ভূমিকম্পের সময় নদীর পানি ওপরে উঠে ঢেউ তুলেছিল। তাঁরা তখন মসজিদে ছিলেন। অনেকেই ভয় পেয়ে বাইরে বের হয়ে যান। পরে বুঝতে পারেন ভূমিকম্প হয়েছে। জীবনে এমন কম্পন আগে দেখেননি বলেও জানান তিনি। কম্পনের সময় শ্যামনগরের নকিপুর বাজারের অনেক ব্যবসায়ীও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
ভূমিকম্পে আহত হয়ে তিনজন শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ভুরুলিয়া এলাকার নুর আলী মোড়লের স্ত্রী ফয়জুন্নেছা (৭৫) হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। অন্য দুইজন- ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের গুমানতলী এলাকার আরিফুল ইসলাম (১৮) এবং আটুলিয়া ইউনিয়নের হাওলভাঙ্গী এলাকার গর্ভবতী নারী আঁখি আক্তার (২০) প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে গেছেন।
শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সাকির হোসেন বলেন, ভূমিকম্পে আহত তিনজন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এদিকে সাতক্ষীরার তালা উপজেলাতেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, জুমার নামাজের প্রায় শেষের দিকে প্রায় ৩০ সেকেন্ড ধরে কম্পন অনুভূত হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে অনেক মুসল্লি মসজিদ থেকে বাইরে বের হয়ে আসেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
তালা উপজেলার সুভাষীনি গ্রামে একটি মাটির ঘরের দেয়াল ভেঙে পড়েছে। এছাড়া নগরঘাটা ইউনিয়নের বাজে বাড়ি এলাকায় একটি মাটির ঘরের টালির চাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
আশাশুনির বিছট গ্রামর স্কুল শিক্ষক আবু দাউদ জানান, জুম’আর নামাজ শেষে আমরা বেশ কিছু মুসল্লি মসজিদে বসে ছিলাম। হঠাৎ প্রচন্ড ঝাকুনি দিয়ে ভূমিকম্পের ফলে মসজিদ ঘর কেপে উঠে। এসময় ভয়ে অনেক মসজিদ থেকে দ্রুত বেরিয়ে যান। তিনি বলেন, আমার জিবদ্দশায় এরকম ভূমিকম্পন আমাদের এই এলাকায় আর কখনো অনুভূত হয়নি।
আনুলিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার জানান, জুম’আর নামাজ আদায় করতে মসজিদে থাকা অবস্থায় প্রচন্ড ঝাকুনিতে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এসময় মসজিদের মুসল্লারা ভয়ে অনেকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যান। তিনি বলেন, এর আগে কখনো এই অঞ্চলে এতজোরে ভূমিকম্পন অনুভূত হয়নি। হঠাৎ ভূমিকম্পনের ফলে গ্রামের মানুষের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ঘর ছেড়ে বাইরে চলে আসেন।
সাতক্ষীরার প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা, যা খুলনা বিভাগের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এবং সাতক্ষীরা শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প।
এবিষয়ে জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতার জানান, মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত বুধবার রাতেও দেশে ৫ দশমিক ১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল, যার উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারে। সেটিও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হয়।